সালাত

নামাজ কি এবং নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

একজন মুসলমানের প্রথম কর্তব্য হলো নামাজ পড়া এবং নামাজ একজন মানুষের ওপর ফরজ। আজকের আলোচনায় আমরা নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

 

নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করা ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কোরআনে নামাজকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৮০টি জায়গায় নামাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর শত শত হাদিসে যথাযথ ভাবে নামাজ আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামে মৌলিক স্তম্ভ হলো ৫টি, যার মধ্যে সালাত সর্বপ্রথম ।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

নামাজের প্রভাব সকলের দ্বারা স্বীকৃত হয় একজন ব্যক্তিকে অশ্লীলতা, অশ্লীলতা এবং পাপ থেকে বিরত রাখার জন্য কোন নামাজ সব থেকে গুরুকপূর্ন।

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
“নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে।” [সূরা আনকাবুত: ৪৫]

যখন একজন বান্দা আল্লাহর কাছে আসে, এবং সে সুখ, বিনয়, স্থিতিশীলতা এবং ভালবাসার সাথে নিয়মিত সালাত শুরু করে, তখন এই সালাত তার হৃদয়কে অপরাধবোধ থেকে পরিষ্কার করে এবং পবিত্র করে।

তাকে অন্যায় ও অপরাধ থেকে দূরে রাখে। এই সালাত তাকে সততা, পবিত্রতা, মহান আল্লাহতালার প্রতি ভালবাসা এবং আল্লাহতালার ভয়ের গুণাবলী দান করে। এই কারণেই ইসলামে নামাজের এত গুরুত্ব, সকল ফরজ ইবাদতের চেয়ে নামাজের শ্রেষ্ঠত্ব। আর এ কারণে নবীর রীতি ছিল যে, কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে প্রথমে তাকে তাওহীদ শেখার পর নামাজ পড়ার নির্দেশ দিতেন, তিনি ওয়াদা করেছিলেন।

নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে এশা ও ফজরের জামাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই সময়ে মানুষ সাধারণত পরিবার ও বিশ্রাম নিয়ে সময় কাটায়। ফলে এ দুই জামাতে রয়েছে যথেষ্ট অবহেলা ও অবহেলা। এ কারণে হাদিসে বিশেষভাবে উৎসাহিত ও উৎসাহিত করা হয়েছে।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي النِّدَاءِ وَالصَّفِّ الْأَوَّلِ ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لَاسْتَهَمُوا عَلَيْهِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِي التَّهْجِيرِ لَاسْتَبَقُوا إِلَيْهِ، وَلَوْ عَلِمُوا مَا فِي الْعَتَمَةِ وَالصُّبْحِ لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا»

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যদি নামাযের আযানের ফযীলত জানতো এবং নামাযের প্রথম কাতারে দাঁড়াতো তাহলে লটারি ছাড়া আর কোন উপায় থাকতো না। এ জন্য তারা লটারি খেলত। এবং যদি তারা জানত যে দুই ঘণ্টার (জোহর ও জুমুআ) নামাজের শুরুতে কি ঘটছে, তবে তারা তাড়াহুড়ো করত। আর এশা ও ফজরের নামাযে কি আছে তা যদি তারা জানতেন, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও উভয় নামাযেই উপস্থিত হতেন।

[সুনান আন-নাসায়ী, হাদীস নং 671]

সুন্নত নামাযের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ফজরের দুই রাকাত সুন্নত। হাদীসে এর মহৎ ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে, যা অন্যান্য সুন্নাতের ক্ষেত্রে নয়।

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ لَمْ يَكُنْ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى شَيْءٍ مِنْ النَّوَافِلِ أَشَدَّ مِنْهُ تَعَاهُدًا عَلَى رَكْعَتَيْ الْفَجْرِ.

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের চেয়ে কোনো নফল নামাযকে বেশি গুরুত্ব দিতেন না।

[সহীহ বুখারী, হাদীস নং 1169]

 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ফজরের দুই রাকাত (সুন্নাত) দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ 

৫ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজরের নামাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোন ব্যক্তি সকালে জামাতে ফজরের নামাজ পড়ে, সকালের তাজা বাতাস তাকে স্পর্শ করে, যার কারণে সে অনেক রোগ থেকে নিরাপদ থাকে। একজন বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করা হলো কেন সকালের বাতাস কি এত মিষ্টি ও বিশুদ্ধ? তখন বৃদ্ধ বললেন, কারণ মুনাফিকদের নিঃশ্বাস সকালের বাতাসের সাথে মিশে না, কারণ মুনাফিকরা এই ফজরের নামাজ জামাতে পড়তে পারে না, সত্যিকারের মুমিনরা ফজরের আযানের সময় বিছানায় শুয়ে থাকে না, তারা মসজিদে আসে। শীত বা গ্রীষ্মে সবসময় তারা জামাতে নামায আদায় করে.

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শত্রুরা তোমাকে তাড়া করলেও এ দুই রাকাত ছেড়ে যেও না। (আবু দাউদ)।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অনেক মুসলমান নামাজ পড়ে না। আর যারা নামাজ পড়েন তাদের অনেকেই ফরজ নামাজ নিয়মিত আদায় করতে পারেন না। যারা নিয়মিত পড়েন তাদের মধ্যেও অনেকে জামায়াতে যোগ দিতে পারেন না।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে তার আমলগুলোর মধ্যে যে আমলের হিসাব সর্ব প্রথম নেওয়া হবে, তা হলো নামাজ। নামাজ ঠিক হলে সে পরিত্রাণ ও সফলতা লাভ করবে। (নামাজ ঠিক না হলে) ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্য এক বর্ননায় রাসূল (স:) বলেন,
শেষ বিচারের দিন হিসাব-নিকাশের সময় ফরজ নামাজে ঘাটতি হলে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন, দেখ আমার বান্দার কি কোনো নফল (নামায) আছে কি? তখন তার নফল নামাজের মাধ্যমে ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণ হবে। এরপর অন্য সব বিষয়গুলো একইভাবে গণনা করা হবে। আবু দাউদ।

নামাজের গুরুত্ব
অনেক মুসলমান আছে যারা অজ্ঞতাবশতঃ কোনো তয়াক্কা না করে সালাত এড়িয়ে যায় এই ভেবে যে তারা মনে করে এখনো অনেক সময় আছে, বয়স হোক তার পর নামাজ পড়বো। নবীর হাদিসে তাদের জন্য কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। নবী (সাঃ) নামায না পড়াকে কুফর ও কুফরীর স্বভাব বলে উল্লেখ করেছেন।

এক হাদীসে এসেছে,

لَا سَهْمَ فِي الْإِسْلَامِ لِمَنْ لَا صَلَاةَ لَهُ. قال الهيثمي: وَفِيهِ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعِيدِ بْنِ أَبِي سَعِيدٍ، وَقَدْ أَجْمَعُوا عَلَى ضَعْفِهِ.

“যার ভিতরে নামায নেই, তার ভিতর দ্বীনের কোনো হিস্যা নেই।” [মুসনাদে বায্যার, হাদীস নং ৮৫৩৯]

অপর এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন,

إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ

“কোনো বান্দা আর কুফর-শিরকের মাঝে পার্থক্য বোঝা যাবে তার নামায তরকের দ্বারা।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪]

 

নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে আরো কিছু হাদিস আছে
হাদীসের উদ্যেশ্য হলো, যখন কেউ নামাজ ছেড়ে দিলো, তখন সে যেন কুফরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলো। তার নামাজ না পড়াটা কুফরি কাজের সমতূল্য হলো। একজন কাফের নামাজ পড়ে না ৷ অপরদিকে নামধারি একজন মুসলিমও নামাজ ছেড়ে দিলো ৷ দুজন নামাজ না পড়ার বিষয়ে একি কাজ করলো ৷ সুতরাং নামাজ ছেড়ে দেয়াটা কুফরির মতো হলো ৷

নামাজ আদায় কত বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর নামাজ না পড়াটা কত বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় সামনের হাদীস থেকে তা কিছুটা অনুমান করা যাবে। নবীজী ইরশাদ করেন,

مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا كَانَتْ لَهُ نُورًا، وَبُرْهَانًا، وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يُحَافِظْ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهُ نُورٌ، وَلَا بُرْهَانٌ، وَلَا نَجَاةٌ.

“যে ব্যক্তি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যত্নের সাথে আদায় করবে, কেয়ামতের সময় এ নামায তার জন্য আলো হবে, তার ঈমান ও ইসলামের দলিল হবে এবং তার নাজাতের ওসিলা হবে। আর যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত নামায আদায় করবে না, কেয়ামতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে নামায তার জন্য আলো হবে না, দলিল হবে না এবং সে আযাব ও শাস্তি থেকে রেহাইও পাবে না।” [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৫৭৬]

এই হাদীস আমাদের কী কি বুঝিয়ে দিলো? আমরা যদি নামাজে যত্নবান না হই, তবে হাশরে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে! এটা আমাদের চিন্তা করা উচিত এবং ভাবা উচিত৷

চলুন জেনে আসি বেনামাজীর হাশর কেমন হবে?
দুনিয়ার জীবনে বেনামাজী প্রকৃতপক্ষে সফল তো হতে পারবেই না ৷ আর কিয়ামতের দিন বেনামাজী কঠিন অপদস্থতা ও লাঞ্ছনার শিকার হবেএবং কঠিন থেকে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে ৷ কুরআনুল কারীমের একটি আয়াতে তার বিবরণ এসেছে ৷ যার সারমর্ম নিম্নরূপ–

يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ .خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ

কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে যখন আল্লাহ তাআলার বিশেষ নূর প্রকাশ পাবে এবং সকল মানুষকে সিজদায় পড়ে যেতে বলা হবে, তখন (যে খোশনসীব দুনিয়াতে নামাজ পড়তো, সে তো সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু) যারা নামাজ পড়তো না, তারা সিজদার জন্য ঝুঁকতেই পারবে না। (কারণ তাদের কোমরকে কাঠের মতো শক্ত করে দেওয়া হবে।) ভয় ও লজ্জার কারণে তাদের চক্ষু অবনমিত থাকবে। লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার আযাব তাদেরকে ঘিরে ফেলবে। এ শাস্তি এই জন্য যে, দুনিয়াতে তাদেরকে সিজদার প্রতি আহ্বান করা হতো, যখন তারা সুস্থ সবল ছিলো। তা সত্ত্বেও তারা সিজদায় ঝুঁকে পড়তো না। [সূরা কলাম, আয়াত ৪২-৪৩]

হাদীসে বিষয়টির ব্যাখ্যা এসেছে এভাবে–

آدَمُ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ خَالِدِ بْنِ يَزِيْدَ عَنْ سَعِيْدِ بْنِ أَبِيْ هِلَالٍ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ عَنْ أَبِيْ سَعِيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ يَقُوْلُ يَكْشِفُ رَبُّنَا عَنْ سَاقِهِ فَيَسْجُدُ لَهُ كُلُّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ فَيَبْقَى كُلُّ مَنْ كَانَ يَسْجُدُ فِي الدُّنْيَا رِيَاءً وَسُمْعَةً فَيَذْهَبُ لِيَسْجُدَ فَيَعُوْدُ ظَهْرُهُ طَبَقًا وَاحِدًا.

আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আমাদের প্রতিপালক যখন তাঁর পায়ের গোড়ালির জ্যোতি বিকীর্ণ করবেন, তখন ঈমানদার নারী ও পুরুষ সবাই তাকে সাজ্দাহ করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানো ও প্রচারের জন্য সাজ্দাহ করত, তারা কেবল বাকী থাকবে। তারা সাজদাহ করতে ইচ্ছে করলে তাদের পিঠ একখণ্ড কাঠের ন্যায় শক্ত হয়ে যাবে।
[সহিহ বুখারী]

এই হাদিসটিতে একজন মুমিনের জন্য একটি সতর্কবাণী এবং একজন অবিশ্বাসীর জন্য একটি চমৎকার শিক্ষা রয়েছে কারণ একজন মুরতাদ, সে যতই অপমানিত হোক এবং শাস্তি হোক না কেন, সে তার প্রাপ্য।

নামাজ আমাদের মুসলিম পরিচয় নামাজ আল্লাহতালার সাথে একজন বান্দার সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে এবং মানুষকে আল্লাহতালার রহমতের অধিকারী করে। সুতরাং নামায ব্যতীত মুসলমান হওয়ার দাবিটি দলিলহীন ও ভিত্তিহীন।

নামাজ পড়ার উপকারিতা
নামায আমাদের উপর ফরয। নামায পড়াতে আল্লাহতায়ালার বিশেষ রহমত ও ভালোবাসা রয়েছে। নামাজ পড়লে তার অপরাধ মুছে ফেলা হয়, তার জীবন পাপের দাগ পরিষ্কার হয়, তার হৃদয় আল্লাহতায়ালার আলো দ্বারা আলোকিত হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। হাদিস শরীফে প্রিয় নবী (সাঃ) খুব সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন, পড়ুন তার ভাষায়-

رَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهْرًا بِبَابِ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ مِنْهُ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسَ مَرَّاتٍ، هَلْ يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ؟ قَالُوا: لَا يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ، قَالَ: فَذَلِكَ مَثَلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ، يَمْحُو اللهُ بِهِنَّ الْخَطَايَا

“বলো তো, তোমাদের কারো ঘরের পাশেই যদি নহরনালা বহমান থাকে, আর সে তাতে দিনে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবারা বললেন, ইয়া রাসুল আল্লাহ! কোনো ময়লা থাকতে পারে না। নবীজী বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেরও উদাহরণ তেমন। এর বরকতে বান্দার গোনাহখাতা মাফ হয়ে যায়।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৬৭]

জামায়াতে নামায পড়ার গুরুত্ব  ফজীলত

নামাজের প্রকৃত ফজীলত ও বরকত জামাতে নামাজ পড়ার দ্বারাই হাসিল হয়। নবীজী সাঃ জামাতে নামাজ পড়ার উপর কঠিনভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যারা অসতর্কতা ও অলসতার কারণে জামাতে শরিক হয় না, নবীজী একবার তাদের সম্পর্কে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ৷ পড়ুন তার ভাষায়–

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّ أَثْقَلَ صَلاَةٍ عَلَى الْمُنَافِقِينَ صَلاَةُ الْعِشَاءِ وَصَلاَةُ الْفَجْرِ وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا وَلَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلاَةِ فَتُقَامَ ثُمَّ آمُرَ رَجُلاً فَيُصَلِّيَ بِالنَّاسِ ثُمَّ أَنْطَلِقَ مَعِي بِرِجَالٍ مَعَهُمْ حُزَمٌ مِنْ حَطَبٍ إِلَى قَوْمٍ لاَ يَشْهَدُونَ الصَّلاَةَ فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ بِالنَّارِ ‏”‏ ‏.

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “ইশা ও ফাজরের সলাত আদায় করা মুনাফিক্বদের সর্বাপেক্ষা কঠিন। তারা যদি জানত যে, এ দু’টি সলাতের পুরষ্কার বা সাওয়াব কত তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বুক হেঁচড়ে হলেও তারা এ দু’ওয়াক্ত জামাআতে উপস্থিত হত | আমি ইচ্ছা করেছি সলাত আদায় করার আদেশ দিয়ে কাউকে ইমামতি করতে বলি। আর আমি কিছু লোককে নিয়ে জ্বালানী কাঠের বোঝাসহ যারা সলাতের জামা‘আতে আসে না তাদের কাছে যাই এবং আগুন দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দেই।”
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৬৮]

সতর্ক হবার জন্য আর কোনো কথার প্রয়োজন পড়ে না ৷ বোঝার জন্য এই একটি হাদীসই যথেষ্ট যে, জামাত তরক করাটা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিকট কতটা অপছন্দীয় ছিলো। অপর এক হাদীসে এসেছে,

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ صَلاَةُ الْجَمَاعَةِ أَفْضَلُ مِنْ صَلاَةِ الْفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً ‏”‏ ‏.‏

‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “জামা‘আতের সাথে সলাত আদায় করা সলাত একাকী আদায় করা সলাত থেকে সাতাশ গুণ অধিক মর্যাদা সম্পন্ন।”
[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৬৩]

একাকী নামাজের তুলনায় জামাতে নামাজ পড়ার অনেক কল্যাণকর। পরকালের কল্যাণ রয়েছে এবং দুনিয়াতে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

জামাতে নামাজ পড়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা তৈরি হয়। এলাকার ধর্মপ্রাণ ভাইদের সাথে দিনে পাঁচবার একত্রিত হওয়া মহৎ কাজের সুযোগ করে দেয়।

দূর থেকে বাসায় এসে সবার সাথে দেখা করা সম্ভব না, কিন্তু জামায়াতে এসে এলাকার সকল মানুষদের সাথে দেখা হয় জামায়াতের নামাজ আদায়ের মাধমে।

সুতরাং, বড় কথা হল যে, যারা জামাতে যোগদান করে তাদের প্রত্যেকের নামায পুরো মসজিদের জামাতের অংশ হয়ে যায়। মসজিদের ওই জামাতে আল্লাহর কিছু নেককার বান্দা আছেন, যাদের নামাজে খুশিতে মন ভরে যায়।

যখন আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করেন, তখন আল্লাহর রহমত ও রহমতের সান্নিধ্যে আশা করা যায় যে, আমার দোয়া সে গুণের না হলেও আল্লাহ তায়ালা এই দোয়াগুলোর সাহায্যে আমার দোয়াও কবুল করবেন।
তাই জামায়াতের প্রতি নিরঙ্কুশ নাফরমানি পরিত্যাগ করলে আমরা কত সওয়াব ও নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হব তা ভেবে দেখা উচিত।

উল্লেখ্য, জামাতে নামাজ পড়ার এই সুবিধা শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য। হাদিস শরিফে স্পষ্ট আছে যে, মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে ঘরে নামাজ পড়া নারীদের জন্য উত্তম ও কার্যকর।

 

নামাজে মনোযোগ গুরুত্ব

একজন মুসলিম যখন নামাজের জন্য দাঁড়ায় তখন তার মনে দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা আস্তে পারে তাই নামাজে মননিবেশ করা অতন্ত গুরুত্বপূর্ন ।

নামাজে মনোযোগ দেওয়ার উপায়
কেরাত কি তিলাওয়াত করা হচ্ছে তা মনযোগ দিয়ে ধীর স্থির এবং শুদ্ধ ভাবে তিলাওয়াত করা বা সর্বং করা এবং মনে রাখে। নামাজে তাড়াহুড়া না করা. কেউ কেউ তাড়াহুড়া করে তাশাহহুদ পড়ে ইটা ঠিক নয় । মনকে নিয়ন্ত্রণ করে ধীরে ধীরে নামাজ পড়া সবথেকে ভালো উপায়।

মনোযোগের সাথে সালাত আদায় করার অর্থ হল আপনি যখন নামাজে দাঁড়াবেন তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে আল্লাহ বিশেষভাবে উপস্থিত আছেন।

এটি শরীর ও মনকে আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসায় পূর্ণ করবে এবং অন্তরে তাঁর মহিমা ও মহিমার কাছে আত্মসমর্পণের অনুভূতি জাগ্রত করবে। যেন মহা অপরাধে ধরা পড়ে পরম প্রতাপে এক রাজার সামনে দাঁড়ালাম! নামাজে দাঁড়িয়ে ভাবুন, আমি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মাথা নত করার সময় ভাবি, আমি আল্লাহর মহিমা ও মহিমার সামনে নিজেকে সমর্পন করলাম। নিজেকে সেজদা করার সময়, অনুভব করার চেষ্টা করুন যে আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহতালার অসীম ক্ষমতা ও মহিমার সামনে আমার অস্তিত্বের সমস্ত অপূর্ণতা এবং অন্যায়কে বিলীন করে ইহকাল এবং পরকালের কল্যাণের আশায় নিজেকে সমর্পন করছি।

মনোযোগের শীত নামাজ না পড়লে সেই নামাজ কোনো কাজে আসে না ৷ এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা কঠোর হুঁশিয়ারি করেছেন ৷ কুরআন বলছে—

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ
অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর।
الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ
যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর।

নামাজে মনযোগ আনার সহজ কৌশলঃ
নামাজে যা কিছু পড়া হয়, তা বুঝে বুঝে পড়তে হবে। এতে নামাজের আসল স্বাদ অনুভব করা সহজ হয়। নামাজের রূহ বা প্রাণ হলো হৃদয়ের আল্লাহমুখিতা ও একাগ্রতা। এমন নামাজ যে বান্দার নসীব হবে, সে সুনিশ্চিতভাবে কামিয়াব ও সফল। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ

ঐ সকল মুমিন সফল ও কামিয়াব, যারা খুশুখুজুর সঙ্গে নিয়মিত নামায আদায় করে। [সূরা মুমিন আয়াত ১-২]

এক হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-

خَمْسُ صَلَوَاتٍ افْتَرَضَهُنَّ اللَّهُ تَعَالَى مَنْ أَحْسَنَ وُضُوءَهُنَّ وَصَلَّاهُنَّ لِوَقْتِهِنَّ وَأَتَمَّ رُكُوعَهُنَّ وَخُشُوعَهُنَّ كَانَ لَهُ عَلَى اللَّهِ عَهْدٌ أَنْ يَغْفِرَ لَهُ، وَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ فَلَيْسَ لَهُ عَلَى اللَّهِ عَهْدٌ، إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ

পাঁচটি নামায আল্লাহ ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি যথানিয়মে ওজু করবে এবং যথাসময়ে নামায আদায় করবে, উত্তমরূপে রুকু সিজদা করবে এবং খুশুখুজুর সঙ্গে নামযগুলি পড়ে যাবে, তার জন্য আল্লাহ তাআলার ওয়াদা রয়েছে, তিনি অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু যে ব্যক্তি যথাযথভাবে নামায আদায় করবে না তার জন্য আল্লাহ পাকের কোনো ওয়াদা নেই। চাইলে তাকে তিনি শাস্তি দিতে পারেন, ক্ষমাও করতে পারেন। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪২৫]

অতএব, মহান আল্লাহতালা আমাদেরকে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দান করুক এবং জেনে বুঝে সঠিক ভাবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার তাওফিক দেন করুন। আমিন। আর ইটা যেন হয় জামাতের সহিত। হে আল্লাহ আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী বানান এবং ইহকাল এবং পরকালে নাজাত দেন করুন, আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *